বাংলাস্ফিয়ারঃ ছাত্র সংসদের নির্বাচনের দাবিতে পাঁচ পড়ুয়ার অনশন ত্রয়োদশ দিনে পড়তেই সমস্ত পাঠ্যক্রমের ক্লাস অনলাইনে সরিয়ে নিল জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। শনিবার প্রশাসন জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা চলবে। পড়ুয়াদের নিরাপত্তার স্বার্থে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের দাবি মেটানোর বদলে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদের পরিসর সংকুচিত করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বিভাগীয় প্রধান, ডিন, শিক্ষক এবং পড়ুয়াদের অনলাইন ক্লাসের সময়সূচি মেনে চলতে বলা হয়েছে। নিয়মিত পঠনপাঠনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী ও সহায়তার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে শিক্ষকদের। কবে শ্রেণিকক্ষে ক্লাস ফিরবে, তা জানানো হয়নি।

শনিবার সকাল প্রায় ১১টায় রেজিস্ট্রার ও কয়েকজন অধ্যাপকের প্রতিনিধিদল অনশনকারীদের সঙ্গে দেখা করে। দাবি খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠনের কথা জানিয়ে তাঁরা অনশন প্রত্যাহারের আবেদন জানান। কিন্তু গালিবের মূর্তিসংলগ্ন প্রাঙ্গণে অবস্থান এবং অনশনকারীদের সরানো নিয়ে দু’পক্ষের বিরোধ তীব্র হয়। দুপুরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক বন্ধ হয়ে যায়। পড়ুয়াদের অভিযোগ, তাঁদের ক্যাম্পাসে ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছিল।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, প্রতিবাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা অন্য জায়গা দখল করেছিলেন। প্রায় দু’ঘণ্টা বোঝানোর পরেও তাঁরা স্লোগান দিতে থাকেন এবং শিক্ষক, কর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীদের ধাক্কা দেন বলে অভিযোগ প্রশাসনের। আন্দোলনকারীরা এই বিবরণ মানেননি। তাঁদের পাল্টা অভিযোগ, প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনার মধ্যেই তাঁবু খুলে দেওয়া এবং অনশনরত পড়ুয়াদের জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়।

এর পরে অনশনরত পাঁচজনকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ভবনের ভিতরে নিয়ে যান সহপাঠীরা। প্রশাসনের কর্মীরা যাতে তাঁদের সরাতে না পারেন, সে জন্য দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন। এই টানাপড়েনের মধ্যেই বিকেল প্রায় তিনটেয় অনলাইন ক্লাসের বিজ্ঞপ্তি জারি করেন রেজিস্ট্রার।

গত ১২ অক্টোবর শুরু হওয়া আন্দোলনের প্রধান দাবি, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সূচি জানিয়ে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিবাদী পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার এবং চিফ প্রক্টর ও নিরাপত্তা উপদেষ্টার অপসারণ চাইছেন আন্দোলনকারীরা। জামিয়ায় ২০০৫ সালের পরে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়নি; ২০০৬ সালে সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। পড়ুয়াদের বক্তব্য, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে প্রশাসনের কাছে কার্যকরভাবে কথা বলার সুযোগ সীমিত।

লাইভমিন্টকে পড়ুয়ারা জানিয়েছেন, শুধু কমিটির আশ্বাসে তাঁদের আস্থা ফিরছে না। ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গেই নির্বাচনের সময়সীমা নির্দিষ্ট করার দাবি তুলেছেন তাঁরা। বিপর্যয় ব্যবস্থাপনার ছাত্রী নওশিন ফারুকের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় নিয়ে কমিটি তৈরির প্রস্তাব আন্দোলনকে দুর্বল করতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর পড়ুয়া আখিল মুহাম্মদও বলেছেন, অনির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে নির্বাচনের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার প্রয়োজন।

শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। মুহাম্মদের দাবি, অনশনকারী আইনপড়ুয়া এবিন বাসিলকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে, অন্য এক পড়ুয়াকে ছয় মাসের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে। কয়েকজনকে কারণ দর্শানোর নোটিসও দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীরা এসব ব্যবস্থা প্রত্যাহারের পাশাপাশি প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার জন্য ভবিষ্যতে শাস্তি না দেওয়ার নিশ্চয়তা চাইছেন।

আন্দোলনে এনএসইউআই, এসএফআই, আইসা-সহ বিভিন্ন সংগঠনের পড়ুয়ারা একসঙ্গে অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, রাজনৈতিক মতভেদ সরিয়ে ছাত্রস্বার্থে ঐক্য গড়ে উঠেছে। আন্দোলনের পরে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে নভেম্বর মাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ঘোষণাও তাঁদের উৎসাহ দিয়েছে। জামিয়ার পড়ুয়ারা মনে করছেন, নির্বাচিত সংসদ থাকলে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের সমস্যাও জোরালোভাবে তুলে ধরা যাবে।

এদিকে ছাত্র সংগঠন আইসা অভিযোগ করেছে, আলোচনা চলাকালীন অনশনকারী ও অবস্থানস্থলে আক্রমণ হয়েছে। প্রতিবাদীদের তরফে আনাস জানিয়েছেন, সংসদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। ফলে অনলাইন পঠনপাঠনের নির্দেশ এলেও ছাত্র প্রতিনিধিত্ব ও নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি।